Syed Mehedi Hasan
← Home Philosophical Essays

Beyond the equations.

My writings outside physics are usually written in Bengali. Here are some of them — rough translations are included in case someone is interested.

Causation or Correlation? কজেশন নাকি কো-রিলেশন Feb 2025
Illustration for “Causation or Correlation?”

জগতে যা ঘটতে থাকে তা থেকে আমাদের স্মৃতির সাবজেক্টিভ বুঝকে আলাদা করা সম্ভব না। মানে স্মৃতিকে বস্তুজগত থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু কিংবা বস্তুজগতকে স্মৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু ভাবার অবকাশ নাহি।

বস্তজগতের ন্যারেটিভ আমরা যেই টুল দিয়ে তৈরী করি তাকে বলতে পারি "কজ" বা "কারণ"। অর্থাৎ যা ঘটে তা সবসময় "কোনো কারণে" ঘটে, এমন বিবেচনার উপর ভর করে আমরা "প্রেডিকশন" নামক একটা ধারণা (কনসেপ্ট) সৃষ্টি করতে থাকি। 'করতে থাকি' বললাম কারণ এই কনসেপ্টটা কাউকে শিখায় দেয়া লাগে না। মানুষ জন্মের পর থেকেই কাজটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে করতে থাকে নিজের চারপাশকে পারসিভ করার জন্য, মানে ব্যাপারটা আমাদের ইনহেরেন্ট আরকি। যেন আমারা ধরেই নেই জগতের সমস্ত আন্ত:সম্পর্ক (কো-রিলেশন) "কারণের" বেড়াজালে বন্দী। যেন আন্ত:সম্পর্কগুলা এপ্রক্সিমেশন, যার মূলে আছে মাইক্রো-কজালিটি এবং "স্মৃতি" যার সূত্রধর। যেনোবা "স্মৃতি"র একমাত্র কাজ হইতেছে কো-রিলেশনের জঙ্গলে হারায় যাওয়া কজালিটিগুলারে হাতড়ায় বাইর করা।

কিন্তু ব্যাপারগুলাকে আমরা অন্যভাবেও তো বলতে পারি। ন্যারেটিভটা "স্মৃতি" থেকে সাজানো শুরু করতে পারি, যেহেতু বস্তুকে আমরা স্মৃতি থেকে আলাদা করতে পারি না। এইভাবে শুরু করলে স্মৃতি তো চলমান কিছু না, একটা স্থিরচিত্র। মানে গতকালকের ঘটে যাওয়া ঘটনা আর এক বছর আগের ঘটনা আমার স্মৃতিতে দূরে দূরে তো নাই, পাশাপাশিই তো বইসা আছে। এইভাবে "টাইম ল্যাপ্স" আর "টাইম কোল্যাপ্স" এক ফুটিং এ চলে আসে। মানে সময় পার হয়ে গেলে কাহার পরে কি ইহা গুরুত্বপূর্ণ থাকে না, এমনকি "কাহার পরে কি" ব্যাপারটার অস্তিত্বই তো থাকে না। কজেশনগুলা এইভাবে হয়ে ওঠে 'নট নেসেসারি মিন' আর কোরিলেশনগুলা কংক্রিট। After significant time lapse, only pattern remains. There is actually nothing but "correlations", whereas "causation" becomes vague, even irrelevant...

তাহলে যেটা বুঝা যাচ্ছে, আমার সাবজেক্টিভ এক্সপেরিয়েন্সকে প্রায়োরিটি দিলে কোরিলেশনগুলাই জগৎ ব্যাখ্যার প্রাইমারি টুল হিসাবে হাজির হয়, আর "কজেশনগুলা" মানব-নির্মিত একেকটা ভূত, যা আমাদের দুনিয়াবি স্যানিটি রক্ষা করে। এই চক্ষুতে যদি ভবিষ্যৎকেও দেখা শুরু করি, সেইটাও একটা স্থিরচিত্রই হয়ে ওঠে, তবে এই দেখাটা কঠিন, যেহেতু আমরা যতোটা অতীতদর্শী ততোটা দূরদর্শী না।

-- ফেব্রুয়ারী ১৭, ২০২৫ ইং

Narrativism আখ্যানবাদ Sep 2022
Illustration for “Narrativism”

১))

আখ্যানবাদ, কিংবা ব্যাখ্যাবাদ, ইংরেজিতে বলা যেতে পারে "narrativism"। এমন একটা ধারণা আপনাদের সামনে পেশ করলাম যা এখনকার জামানায় বুঝতে পারাটা জরুরি বলে আমি মনে করি।

আমার কাছে আখ্যানবাদ হচ্ছে আখ্যানের উপর অগাধ বিশ্বাস স্থাপন করা। সেটা কেমন? উদাহরণ হিসাবে দেয়া যেতে পারে নোয়া হারারির 'সেপিয়েন্স'। আপাতদৃষ্টিতে সেপিয়েন্সকে খুব কনভিন্সিং মনে হবে, কিন্তু একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে অসংখ্য সম্ভাব্য সিনারিও থেকে pick and choose করার ভেতর দিয়ে সেপিয়েন্সের ন্যারেটিভ সাজানো। এমনভাবে দেখানো হচ্ছে যেনো এটাই একমাত্র ব্যাখ্যা।

লেখার উপায়টা একটু বলি। মনে করা যাক ঘটনা "A" হয়েছে। এরপর ঘটলো ঘটনা "Z"। A এবং Z এর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য যদি দেখানো হয় A->B->C->... ->Z, অর্থাৎ কয়েক ধাপের একটা ঘটনাপ্রবাহের ভিতর দিয়ে Z এ পৌছানোর গল্প বলা যায়, তা অনেকেই খুব একটা চিন্তা না করে মেনে নিবেন। এই অনেকগুলি ধাপের ভেতরে প্রতিটা যে cherry picked করা, এটা নিয়ে মানুষ খুব একটা ভাবে না। মানুষ মনে করে এতোগুলো ধাপ পেরিয়ে Z পর্যন্ত লেখক এনেছে অবশ্যম্ভাবী conequence হিসাবে। এতে যা ঘটে তা হলো B,C,D,... ইত্যাদিকেও মানুষ ঠিক ধরে নেয়। এটাই আখ্যানবাদের সমস্যা।

২))

আখ্যানবাদী বুদ্ধিজীবী মাত্রই দুই নম্বর এমন কিন্তু না। অনেকসময় নিজের সাজানো গ্র‍্যান্ড ন্যারেটিভের উপর নিজেরি অগাধ আস্থা তৈরী হয়, তাই এর সমস্যাটা তারা আর চিহ্নিত করতে পারেন না।

এসময়ের বাংলাদেশের অন্যতম বিদগ্ধ পন্ডিত, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ সলিমুল্লাহ খান। নতুন প্রজন্মের অনেকের মাঝে ক্রিটিকাল ভঙ্গি তৈরী করা, দেশ বিদেশের দার্শনিকদের পরিচিত করানো ইত্যাদি ব্যাপারে সলিমুল্লাহ অনবদ্য। অনেক পঠন পাঠনের পর তিনি উপমহাদেশীয় ইতিহাসের একটা গ্র‍্যান্ড ন্যারেটিভ দাড়া করিয়েছেন, যাকে তিনি চশমা হিসাবে ব্যবহার করেন বিবিধ সামাজিক ইস্যু চিহ্নিত করতে। অনেকে সলিমুল্লাহকে 'টীকা বুদ্ধিজীবী' বলেন, খুব রেফারেন্স ব্যবহার করেন বলে। এমন কথাতে আমার আপত্তি আছে। সলিমুল্লাহ অনেক রেফারেন্স দেন ঠিকি, কিন্তু তার নিজস্ব ন্যারেটিভ আছে। তার বিরুদ্ধে আরেক অভিযোগ শোনা যায় যে তিনি শত-হাজার বছরের পুরানো কথা দিয়ে যেকোনো ব্যাখ্যা শুরু করেন। আমি মনে করি এটা তাকে নেসেসারিলি করতে হয় গ্র‍্যান্ড ন্যারেটিভটাকে সামনে আনার জন্যই, যার লেন্স দিয়ে তিনি ইস্যুকে দেখবেন। এটা আনকমন না। বিশেষ করে ভারতের প্রায় সব বুদ্ধিজীবীই আখ্যানবাদে আক্রান্ত।

সমস্যাটা হচ্ছে আখ্যান মাত্রই একমাত্রিক। মানে আখ্যানের জগৎ রৈখিক। সরলরৈখিক বলছি না, জটিলও হতে পারে, তবে রৈখিক। কিন্তু ইতিহাস রৈখিক না, নেটওয়ার্কের মতো, এক বা একাধিক কারণ আর না-কারণের সমন্বয় থাকে এতে। যে জগৎ-সংসারের উপর মানব-ইতিহাসের জাল বিস্তৃত হয়, তা একমাত্রিক না। জগৎ ও জীবনের সসীমতাকে যদি একটা রূপক গোলক হিসাবে কল্পনা করি, তাহলে এই গোলককে মানব ইতিহাসের জাল আচ্ছাদন করে রেখেছে। ইতিহাস কেবল একটা অক্ষাংশে বিচরণ করে না। ঘুরেফিরে সে এক বিন্দুতে আবার ফিরে এলেও তার পরবর্তী চলার পথ আগের মতো নাও থাকতে পারে। কিন্তু 'আখ্যান' একমাত্রিক আর রৈখিক বলে গোলকের উপর তার পথ হয় বৃত্তাকার, সাইক্লিক। এক ন্যারেটিভেই সে ঘুরপাক খেতে থাকে। ইতিহাস এমন জাড্য না।

৩))

ইতিহাস রচনার context ছাড়াও জীবন বা সমাজের context এ 'আখ্যান' শব্দটাকে বিস্তারিত করা যায়। জীবন/সমাজের বাস্তবতাকে একটা গল্পের ছকে বাধতে চাইলে সেই গল্পটাকে আমরা আখ্যান বা ন্যারেটিভ বলতে পারি। গল্পের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার কিছু সুসংজ্ঞায়িত চরিত্র থাকবে। আলাদাভাবে মূল্যবোধ উল্লেখ না করলেও গল্পের চলন বলে দেয় কি ভালো, কি খারাপ। অর্থাৎ গল্পে একটা মোরাল কোড ইনগ্রেইন্ড থাকে। কিন্তু বাস্তবতাকে এসব সীমাবদ্ধতা বহন করতে হবে এমন মনে করার কোনো কারণ নাই।

তবে ন্যারেটিভ ছাড়া আমাদের মস্তিষ্ক বাস্তবতাকে প্রোসেস করতে পারে না। তাই বাস্তবতাকে টলারেবল আকারে সামনে আনার জন্য ন্যারেটিভ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মনে রাখতে হবে ন্যারেটিভ নিজে 'হাকিকাত' না। "Narrative" tells us a toy reality projected through history and tradition. তাই ন্যারেটিভ থেকে যথাসম্ভব নিজেকে মুক্ত করাটাও আমাদের দায়িত্ব। এই কাজটা মুখে বলা যতোটা সহজ, করা ততোটাই কঠিন। আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবন সামাজিক ন্যারেটিভের ভেতরে কাটাই। আমাদের মান-সম্মান, হিংসা-অহংকার এ সবই সমাজের ন্যারেটিভে নিজেদের আপেক্ষিক অবস্থানের উপর ভিত্তি করে তৈরী হয়।

যেমন মনে করা যাক কেউ তিনবার নোবেল পুরস্কার পেলো। তার সামাজিক আখ্যানে এটা বিশাল ঘটনা। কিন্তু আমাজনের রেইনফরেস্টের অধিবাসীর সামাজিক আখ্যানে এই পুরস্কার গুরুত্বহীন। তাই ন্যারেটিভের বাইরে গর্ব করার কোনো অর্থ থাকে না। মর্যাদাও তাই, আখ্যাননির্ভর।

সামাজিক ন্যারেটিভ মানুষের উচিত-অনুচিতকেও ডিকটেট করে৷ যেমন হুমায়ূন আহমেদ যে একজন কমবয়সী মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন, এতে মানুষের যে আপত্তি, তা সামাজিক ন্যারেটিভের কারণে। এই আপত্তির কিন্তু কোনো ধর্মীয় বা আইনগত ভিত্তি নাই। আবার যেমন বাড়িতে কাজের মানুষের সাথে এক টেবিলে খেতে মধ্যবিত্ত সমাজ অস্বস্তি বোধ করে। তারা কিন্তু মাটিতে বসে আবার একসাথে খেতে অস্বস্তি বোধ করেনা। এমন আচরণের কোনো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ভিত্তি নাই। সামাজিক ন্যারেটিভ আমাদের স্বতঃস্ফূর্ততাকে আকার প্রদান করে।

৪))

মানুষ একটা আখ্যানে থাকতে চায়। সে ন্যারেটিভে স্বাভাবিকতা খুঁজে পায়, যা তাকে একটা মানসিক নিরাপত্তা দেয়। সংস্কৃতি আর ন্যারেটিভ কিন্তু এক জিনিস না। ন্যারেটিভ একটা চলমান ব্যাপার, একটা স্রোত, যাতে মানুষ সামিল হতে চায় হাঁসের পালের মতো। অন্যদিকে 'সংস্কৃতি' একটা স্থিরচিত্র, যার দিকে তাকিয়ে সে তার বাড়ি খুঁজে পায়। বাড়ির পাশের এই নদীতে ভাসতে ভাসতে তার জীবন কেটে যায়। বাড়িতে সে ঢোকে না, বাইরে থেকে একটু ঘুরাঘুরি করে আবার নদীতেই ফেরত আসে। সংস্কৃতি আর ন্যারেটিভের সম্পর্ক এমনই।

৫))

আখ্যানবাদের আরেক নাম বলেছিলাম 'ব্যাখ্যাবাদ'। এর কারণ আমরা যখন প্রশ্ন করি বা ব্যাখ্যা করি তার সবসময় একটা pretext থাকে। কিছু জিনিস ধরে নেয়া হয়। যতো বেশি প্রশ্ন বা যতো বেশি ব্যাখ্যা, pretext এর পরিধি ততোই বড়ো হয়। আর প্রিটেক্সট একটা ন্যারেটিভ। তাই ব্যাখ্যা সবসময়ই আখ্যান নির্ভর। এই কারণে ব্যাখ্যার মধ্যে 'হাকিকাত' খুঁজে পাওয়া সম্ভব না।

আইনের দাবি সে সমাজে হাকিকাতের উপর ভিত্তি করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু সে দাঁড়িয়েই আছে প্রশ্ন আর ব্যাখ্যার উপর। "Law" is a false hope to cleanse the narrative to reflect the "truth (huqq)". তাই আইনের উপর আস্থা রাখাটাও আখ্যানবাদিতা। আইন মেনে চলতে হয় একটা সোশাল কন্ট্রাক্টের জন্য ঠিক আছে, কিন্তু আইন মোটেও সার্বজনীন হক প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। তাই আইনের সেবাদাসী (পুলিশ-আর্মি, জজ-ব্যারিস্টার) কিংবা ব্যাখ্যার সেবাদাসীরা (একাডেমিক শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী) অন্যদের থেকে মহৎ কিছু করছে মনে করাটা ভুল চিন্তা।

আখ্যান থেকে সম্পূর্ণ মুক্তিলাভ সম্ভব না হলেও আখ্যান কিভাবে মানবসমাজে অপারেট করে তার প্রতি নজর রাখা জরুরি। এতে 'হক' আর 'হাকিকাত' এর উপর আরোপিত জাড্যতা কিছুটা কমবে।

-- সেপ্টেম্বর ৯, ২০২২ ইং

The Story of the Marginal প্রান্তিকের গল্প আবার কি Aug 2022
Illustration for “The Story of the Marginal”

১))

সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলো যাদের দখলে, মানে সহজকথায় রাষ্ট্রব্যবস্থায় যারা সুবিধাভোগী, তারাই ক্ষমতার শীর্ষে। এরা ঠিক করে দেয় আমাদের ঠিক-ভুল, ফ্যাশন, কালচার, আর্ট, মূল্যবোধ ইত্যাদি। ব্যাপারটা এমন না যে এরা আমাদের থেকে ভিন্নকিছু, এরা আমরাই। আমরা যে স্কুল কলেজে পড়ি, ভালোমন্দ তর্ক-বিতর্ক, কাব্য-গদ্য করি, এগুলা আমাদেরকে এই ক্ষমতাকাঠামোতে প্রবেশের টিকেটটা দেয়, যেনো আমরা এই কাঠামোকেই সবসময় সার্ভ করি। পক্ষে থেকে হোক কিংবা বিপক্ষে। বিপক্ষে যেতে হলেও পক্ষে কি আছে তা অর্গানিকালি জানতে হয়। এই জানাটাই হচ্ছে রেকগনিশন, যা কাঠামোকে সচল রাখে।

এই ক্ষমতাকাঠামোর বাইরেও সমাজব্যবস্থা থাকতে পারে, সেখানেও নিজস্ব ক্ষমতার ডাইনামিকস, মূল্যবোধ, রাজনীতি, সাহিত্য ইত্যাদি থাকে। সেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চর্চা নামেমাত্র, তাই রাষ্ট্রীয় গুরুত্বও নামেমাত্র। এমন সমাজের অধিবাসীদেরকে বলা হয় 'সাব আল্টার্ন'। উদাহরণ হিসাবে দেয়া যেতে পারে বাংলাদেশের পাহাড়ি আদিবাসী, আমাজন রেইনফরেস্টের অধিবাসী, লাদাখের অধিবাসী ইত্যাদি। এমনকি জহির রায়হানের হাজার বছর ধরে উপন্যাসের গ্রামগুলাও এই ক্যাটাগরিতে পড়তে পারে। সাব আল্টার্ন মানেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকাঠামো দ্বারা শোষিত এমন বোঝায় না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকাঠামোর হাত বা আইনের হাত সাব আল্টার্ন পর্যন্ত অনেকসময় পৌছায় না; তাদের সমাজের আচার বিচার তাদের নিজস্ব ভঙ্গিমায় চলে। ঐ সমাজেও শোষণ আছে, অবিচার আছে, যেহেতু এটাও একটা স্ট্রাকচার, তবে লোকাল। রাষ্ট্রকাঠামোর সাথে সাব আল্টার্নের একটা অলিখিত বোঝাপড়া থাকতে হয়। রাষ্ট্র থেকে তারা ততটুকুই নিবে যতটুকু নিলে রাষ্ট্র চেপে বসবে না। এই ব্যালান্সটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিছু নিতে হয় স্বীকৃতিস্বরূপ, আবার নিরাপত্তাও একটা কারণ। অসুবিধাটা ঘটে যখন এই ব্যালান্স নষ্ট হয়, এবং বেশিরভাগ সময় তা ঘটে বটে।

আমাদেরকে বুঝতে হবে সাব আল্টার্ন মানেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকাঠামোর উচ্ছিষ্ট জনগোষ্ঠী না। রাষ্ট্রের সমান্তরালে এদের অবস্থান। এই সমান্তরলতা না থাকলে হয় সাব আল্টার্ন সেল্ফ রিজেকশনের ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার দাস হতে বাধ্য হবে অথবা রাষ্ট্র সাব আল্টার্নে ইনভেইড করে তাকে ডিসিমিনেট করবে।

২))

বাংলা ভাষায় সাব আল্টার্নের অনুবাদ 'নিম্নবর্গ'। আক্ষরিক অর্থ ঠিক হলেও আমি মনে করি এই তর্জমাটা ভুল। তবে এর কারণ ইউরোপীয় মানসিকতাই। তারাও সাব আল্টার্নকে নিম্নবর্গ ধরেই চিন্তা করে। এই চিন্তাধারার ফলে ক্রমন্বয়ে রাষ্ট্র ডিস্টোপিকালি হোমোজেনাস হতে শুরু করে। যেমন ইতালি এতো বড় দেশ হওয়া সত্ত্বেও সবজায়গায় এক ভাষায় কথা বলে। রাষ্ট্রীয় বর্ডার পার হলেই অন্য ভাষা। এই প্রচন্ড আর্টিফিশিয়াল ডিভিশন তখনি হতে পারে যখন চরম কালচারাল শোষণের ভেতর দিয়ে একটা জাতিকে যেতে হয়। ইতালিতে উচ্চারণগত পার্থক্য অঞ্চলভেদে আছে, কিন্তু ভাষা সবখানে একই। কালচারাল পার্থক্যগুলাও প্রকট না। ভাষাগত পার্থক্য যা ছিলো, তার চর্চা তারা ধরে রাখার চেষ্টা করেছে নিজ নিজ পরিবারের মধ্যে, কিন্তু যেহেতু এই পার্থক্যসমেত সাহিত্যচর্চা হয় না, তাই কালক্রমে ঐটুকু পার্থক্যও লুপ্তপ্রায়। রাষ্ট্র তাদের উপর ভাষা, কালচার, খাদ্যাভ্যাস চাপিয়ে দেয়। আবার আমেরিকার দিকে তাকালে আমরা দেখি সব জায়গাই ম্যাকডোনাল্ডস, সবাই ডেমোক্রেট আর রিপাব্লিকান মাইন্ডসেটের বাইনারির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। আমেরিকার ইন্ডিজেনাস পপুলেশন, যারা সত্যিকারের সাব আল্টার্ন হতে পারতো, তাদেরকে অপ্রেসড মাইনরিটি হয়ে থাকতে হয়। যাইহোক, আমি বলতে চাই রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে সাব আল্টার্নের সম্পর্ক ডেলিকেট, যা টিকিয়ে রাখতে হলে সমান্তরাল দৃষ্টিভঙ্গি আর ইন্টারভেনশন মিনিমামে রাখা জরুরি।

৩))

বুঝের গোলোযোগটা কোথায় ঘটে এটা ধরতে হলে আরেকটা শ্রেণি নিয়ে কথা বলা জরুরি। এই শ্রেণীকে বলে প্রান্তিক, ইংরেজিতে ''Marginal"। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মূলত শোষিত জনগোষ্ঠী, যাদের জীবনের নিরাপত্তা সমাজে সর্বনিম্ন পর্যায়ে অবস্তিত। এদের উদাহরণ হিসাবে দেয়া যেতে পারে বাংলাদেশের দরিদ্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, এতিমখানার ছেলেমেয়ে, ভূমিহীন কৃষক ইত্যাদি। খেয়াল করার আছে, সাব আল্টার্ন নিঃশেষ হওয়ার আগে প্রান্তিক হয়ে ওঠে। সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীরা এই প্রান্তিক সাব আল্টার্নকে চিরাচরিত সাব আল্টার্ন হিসাবে দেখাতে চান। এই চাওয়াটা রোমান্টিক, কিন্তু বেঠিক। তারা যখন সাব আল্টার্নের ন্যারেটিভে ইতিহাস বিনির্মান করার কথা বলেন, তারা আসলে শুনতে চান কালচারিস্ট সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীর বয়ানে প্রান্তিকের গল্প। উদাহরণ হিসাবে দেয়া যায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মা নদীর মাঝি'। গল্পের বয়ানে দুইটা দোষ আছে।

প্রথম দোষ-- সাব আল্টার্ন আর প্রান্তিককে এক করে ফেলা। এতে সাব আল্টার্নকে খাটো করা হয়। আমরা দেখতে পাই এই কারণে অদ্বৈত মল্লবর্মণ, যিনি ঐ সাব আল্টার্ন আপব্রিংগিং থেকেই এসেছেন, 'পদ্মা নদীর মাঝি' পড়ে বিরক্ত হচ্ছেন। এরপর উনি নিজেই একটা উপন্যাস লিখে ফেলেন 'তিতাস একটি নদীর নাম'। এই উপন্যাসে তিতাসের তীরবর্তী মালোদের জীবনের একটা আখ্যান পাওয়া যায়। উপন্যাসটা একটা সাব আল্টার্ন জনগোষ্ঠীর কথা বলছে যারা উপন্যাসের শেষভাগে প্রান্তিকে রূপ নেয়। লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে এই উপন্যাসে সাব আল্টার্নকে প্রান্তিক করে দেখানো হয়নি, বরং সাব আল্টার্নের বিলুপ্তিতে প্রান্তিক পরিণতি দেখানো হয়েছে।

দ্বিতীয় দোষ-- প্রান্তিকের গল্প বলার চেষ্টা করা। এটা Dehumanification. একজন প্রান্তিকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা গল্প লিখতে পারি না, কারণ আমরা জানি না এক প্রান্তিক থেকে আরেক প্রান্তিকের পার্থক্য কোথায়, Individualism কোথায়। Individual হিসাবে ধরা দিত যদি তাদের চরিত্রগুলা কোনো গল্পের চরিত্রের মতো হতো, অর্থাৎ গল্পের জড় গ্রামার মেনে চলতো। গল্পের জড় গ্রামার কি? এটা একটা ছক যেখানে কিছু প্রকারের চরিত্র থাকবে। যেমন কমেডি, ট্র‍্যাজিক, জেদী, নায়ক, ভিলেন ইত্যাদি। প্রান্তিক এই জড় গ্রামার মেনে চলে না। সে এক শরীরে দয়ালু, সেই শরীরেই নিষ্ঠুর। সে সবাইকে ধারণ করে, আবার কাউকে না। তাকে প্রতিদিন নতুন সংগ্রাম করতে হয়। আজকের পর কালকে কি খাবে, কোথায় খাবে, এইগুলা ঠিক নাও থাকতে পারে। তাই পরিস্থিতি পড়ার ক্ষমতা থাকতে হয় সাধারণের থেকে অনেক বেশি, যা উচ্চ পর্যায়ের সংবেদনশীলতা তৈরী করে। এখান থেকেই ক্যারেকটার ফ্লুইডিটি তৈরী হয়। একজন প্রান্তিক তার সময়ের সমাজব্যবস্থার গল্পের ছকের বাইরের চরিত্র। যে গল্প দিয়ে সিস্টেম আমাদের ঘুম পাড়িয়ে রাখে, প্রান্তিক তার জাগ্রত ক্রিটিক। ভাঙা-গড়ার ট্রাঞ্জিশনে তার বসবাস, সাধু আর পিশাচের রাস্তা তার।

৪))

ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে প্রান্তিক যখন সভ্য হয়ে ওঠে, সে আর প্রান্তিক থাকে না। চিরাচরিত সাব আল্টার্নের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন না। একজন সাব আল্টার্ন তার মুল্লুক ছেড়ে রাষ্ট্রক্ষমতার বলয়ে প্রবেশ করলেও তার ফেলে আসা সমাজের সুখ- দুঃখ, দ্বন্দ্ব, ভালোবাসার গল্প বলতে পারে। তাই সাব আল্টার্নের ভাষ্যে সাব আল্টার্নকে আমরা চিনতে পারি। কিন্তু প্রান্তিক কোনো ছকে থাকে না বলে সে যখন দুর্দশা কাটিয়ে একটা ছকে প্রবেশ করে, আগের অবস্থাটা সে বিস্মৃত হয়। Its like once you see a pattern in a drawing, you cannot unsee it, you always find that pattern. এই ব্যাপারেও অদ্বৈত দারুণ ইনসাইট দেখিয়েছেন। যুবক অনন্ত যখন পড়ালেখা শেষ করে দাঁড়িয়ে গেছে, বাবুদের সাথে চলাফেরা করছে, গ্রামে ফিরে সে অনন্তবালা আর বাসন্তীকে চিনতে পারে না।

প্রান্তিকের গল্প নাই তা না, বরং হাজার রকম সূক্ষ্ম অনুভূতির সংবেদনশীলতা দিয়ে পরিপূর্ণ খুব জটিল ইগো-ডাইনামিক্স আছে। বয়ানের বিলাসিতা যেখানে গুরুত্বহীন হয়ে ওঠে। আবার প্রান্তিক যখন তার প্রান্তিকতা কাটিয়ে ওঠে, সে অন্য মানুষে পরিণত হয়। তাই বয়ানের বিলাসিতা তৈরী হলেও সে আর কিছু মনে করতে পারে না।

The story of marginals exists. It exists without a narrative, it exists without a storyteller.

-- আগস্ট ২৬, ২০২২

The Canonical Structure প্রামাণিক কাঠামো Feb 2021
Illustration for “The Canonical Structure”

আমরা যেভাবে ভাবি, সেভাবে কি লিখি? আমার মনে হয় না। চিন্তার বাক্স কিংবা বাক্সবন্দী চিন্তা যেমন থাকে, তেমনি লেখার বাক্স কিংবা বাক্সবন্দী লেখাও থাকে। এই বাক্স দিয়ে আমি ভাষার সীমাবদ্ধতা বোঝাচ্ছি না। এটা তৈরী হয় সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায়।

ব্যাপারটাকে একটু খোলাসা করার চেষ্টা করা যেতে পারে কিছু উদাহরণ দিয়ে।

১))

ছোট উদাহরণ দিয়ে শুরু করি। আমি যখন নিজের মতো সুর তৈরী করি, তা যে চিন্তাক্ষেত্র থেকে আসে, সেটা কোনো গতানুগতিক কাঠামো দিয়ে তৈরী হয় না। অর্থাৎ আমি তখন এমন কোনো রুটিন ব্যবহার করি না, যা সুরের গ্রামার বলে যেসমস্ত তত্ত্ব প্রচলিত আছে তার ফল। আবার যা করি তার যে কোনো স্ট্রাকচার নাই তাও না। স্ট্রাকচারটা আমার নিজের। এটা অন্যকে বোঝানো বেশ কষ্টসাধ্য। তবে যদি জিজ্ঞেস করা হয় আমি কি কি করেছি, তাহলে তা গতানুগতিক সুরের তত্ত্ব দিয়েই বোঝানোর চেষ্টা করব। এমনকি এমনভাবে বোঝানোর চেষ্টা করব, যেনো শুনে মনে হয় এই গতানুগতিক নিয়মের বুঝ দিয়ে আমি সুরটা বানিয়েছি। প্রশ্ন হচ্ছে এটা আমি কেন করব? কারণ গতানুগতিক সুরের কাঠামোর যৌক্তিক গতিবিধি ইউনিভার্শাল। আমরা যখন বলি কোনো কিছু প্রমাণিত হয়েছে, তখন আমরা বোঝাই সর্বজন স্বীকৃত একটা যৌক্তিক গতিবিধি দিয়ে তা সিদ্ধ। তাই যেকোনো কথাকে আমরা চেষ্টা করি একটা প্রামাণিক কাঠমোর মধ্যে নিয়ে আসতে। এই ব্যাপারটা ভাব প্রকাশের সামাজিকীকরণের অংশ।

প্রশ্ন হচ্ছে, সব সুর কি এভাবেই তৈরী হতে হয়? প্রামাণিক কাঠামো দিয়ে কি আদতে সুর তৈরী হয় না? অবশ্যই হয়! বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাই হয় বরং। যেমন, সুরের যে গতানুগতিক গ্রামার, তার ভিতরে অবস্থান করে র‍্যান্ডম কিছু প্রগ্রেশন বাজিয়ে বাজিয়ে যেসব জায়গাগুলোতে ভালো লাগছে তার একটা কম্বিনেশন নিয়ে গান বানিয়ে ফেলা যায়। অনেক কমার্শিয়াল গান এভাবেই তৈরী হয়েছে। আবার যারা প্রচুর গান তুলেছেন এবং চর্চা করেছেন, তাদের বিভিন্ন ধরণের মাস্‌ল মেমোরি তৈরি হয়। তাই তাদেরকে যদি একটা লিরিক ধরিয়ে দেয়া যায়, তারা লিরিকের ভাব বুঝে এক কর্ড বাজানোর পর কোন কর্ডে যাবে তা স্বতঃস্ফুর্তভাবে হাতে চলে আসে। ইম্প্রোভাইজ করার ক্ষেত্রেও এই ব্যাপারটা অনেকখানি কাজ করে। তবে আমি মনে করি, শুধু প্রামাণিক কাঠামোর উপর ভিত্তি করে যে সুর সাধনা, তা একপ্রকার সীমারেখায় আবদ্ধ। মূলচিন্তার এখানে তেমন জায়গা নেই। উপস্থিত কাঠামো যে স্থান-কালের প্রতিনিধিত্ব করে, তার বাইরে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। যুগ চলে যাবার সাথে ঐ সুরের প্রাসঙ্গিকতাও চলে যায়। এটা খারাপ কিছু তা বলছি না। এমন সুর ভাঙ্গিয়ে বছরের পর বছর সাস্টেইন করা যায়, তবে বছরের খানা বছরেই খেয়ে নিতে হয়।

অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি সাধনার দুটি মোড আছে--

একটা মোড কোনো প্রামাণিক কাঠামো থেকে আসে না, যাকে আমরা বলতে পারি "মৌলিক সাধনা"। এই সাধনা শুরু হয় একাগ্রচিত্তে একটা আইডিয়াকে কেন্দ্র করে। তারপর তা ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয় ইন্টিউশনের উপর ভর দিয়ে। এর একটা একক ও সার্বিক সত্ত্বা থাকে, নিজস্ব গ্রামার থাকে এবং সাধকের রূহের একপ্রকার প্রতিফলন থাকে। এই সাধনা হতে উৎসারিত ভাবকে আবার মানুষের কাছে তুলে ধরা হয় একটা প্রামাণিক কাঠামোর মধ্যে ফেলে যেনো তা বোধগম্য হয়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে প্রামাণিক কাঠামোর জটিল নিয়ম কানুন ঘেটে সাধক ভাবটি উৎপন্ন করেছেন, কিন্তু আদতে ব্যাপারটা তা নয়। ভাবটি গ্রহণযোগ্য করার জন্য সাধক কষ্ট করে তা প্রামাণিক কাঠামোর মোড়কে মুড়ে প্রকাশ করেছেন। তাই একে আমি বলছি ভাবের সামাজিকীকরণ।

সাধনার দ্বিতীয় মোড কে বলা যেতে পারে "নির্ভার সাধনা"। কারণ এতে আইডিয়ার বোঝা বয়ে বেড়াতে হয় না। প্রামাণিক কাঠামোর উপর ভিত্তি করেই এই সাধনার অস্তিত্ব। যা সর্বসমক্ষে আছে, তাতে কিছু ভ্যারিয়েশন যোগ করে এবং পার্মুটেশন কম্বিনেশন করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নতুন ভাব সৃষ্টি ও তার বিস্তার এর উদ্দেশ্য। যেহেতু এর শেকড়ের গভীরতা অল্প, তাই এই সাধনার প্রাসঙ্গিকতা অনেকখানি স্থান-কালের উপর নির্ভরশীল।

২))

এখন উদাহরণ দেই দর্শনের ক্ষেত্রে।

মিশেল ফুকো অনেক বড় দার্শনিক। কিন্তু তিনি যা লিখেছেন, সেভাবে কি চিন্তা করতেন? শুদ্ধচিন্তা একটা বীজ বোনার মতো ব্যাপার। এটা সূর্যালোক পেয়ে নিজ থেকে বেড়ে ওঠে, ডালপালা আপনাতেই বিস্তৃত হয়। তেমনি মূলচিন্তার জন্য আনুসঙ্গিক হাজার তথ্যের প্রয়োজন হয় না। এর নিজস্ব একটা চলন থাকে, একটা ইন্টিউটিভ জায়গা থেকে থিওরিগুলো মাথায় আসে এবং খুব সামান্য বাহ্যিক ইনফ্লুয়েন্সের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ফুকো যখন ভলিউমিনাস বই লিখছেন তখন কি করছেন তা খেয়াল করার আছে। তিনি Anthropology এবং ইতিহাসের আশ্রয় নিচ্ছেন তাঁর তত্ত্ব ফুটিয়ে তোলার জন্য। এমনভাবে কথাগুলো তিনি বলছেন, যেনো মনে হবে এসব শাস্ত্র পড়ে পড়ে তাঁর থিওরি দাঁড় করিয়েছেন। আসলে ব্যাপারটা তা না। থিওরি অনেক আগেই দাঁড়িয়ে আছে তাঁর শুদ্ধচিন্তার বীজ থেকে জন্ম নিয়ে। নৃ-শাস্ত্র এবং ইতিহাস ব্যবহার করে তিনি তত্ত্বকে প্রামাণিক কাঠামোর মধ্যে ফেলছেন। এটা তত্ত্বের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া। এর প্রয়োজন অবশ্যই আছে মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য।

একটু হিড্‌গেন্সটাইনের দিকে তাকাই। আমরা দেখতে পাবো, তিনি জীবদ্দশায় দুটি বই লিখে গিয়েছেন। তাঁর তত্ত্ব নিয়ে খুব একটা ঘাটাঘটি হয়নি যতোটা না ব্যক্তি তাঁকে নিয়ে হয়েছে। বার্ট্রান্ড রাসেল যদি হিড্‌গেন্সটাইনকে এন্ডোর্স না করতেন, তাহলে তাঁকে কতোজন চিনতো, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। এর কারণ বুঝতে হবে। হিড্‌গেন্সটাইন যেভাবে চিন্তা করেছেন সেভাবেই লিখেছেন। তিনি তাঁর চিন্তাকে প্রামাণিক কাঠমোতে ফেলে প্রকাশ করার উদ্যোগ নেন নি। ফলে তাঁর লেখার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা রাসেল না থাকলে হয়তো কখনো তৈরী হতো না। অটো উইনেঙ্গারের মতো করে হয়তো তাঁকেও সাইডে ফেলে রাখা হতো।

সুতরাং, চিন্তাকে প্রামাণিক কাঠামোতে ফেলে প্রকাশ করার যে অতিরিক্ত খাটুনি নিতে হয়, তা আনএভয়ডেবল রিয়েলিটি। রাসেলের "History of Western Philosophy" তেমনি একটা আনএভয়ডেবল রিয়েলিটি।

প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, তাহলে ইতিহাস এবং নৃ-শাস্ত্র পর্যবেক্ষণ করে কি দর্শন তৈরী করা সম্ভব না? এর উত্তর আগের মতোই। "হ্যা, সম্ভব!"! বেশিরভাগ একাডেমিয়ার দার্শনিকই এমন। তবে ওইযে, এধরণের দর্শনগুলো কোনো রূট চিন্তা থেকে আসে না, তাই স্থান-কালের উপর নির্ভরশীলতা অনেক। সত্যি কথা বলতে যাদেরকে আমরা হাল আমলের বুদ্ধিজীবী বলি, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে কথা বলতে দেখি, তারা মূলত এই প্রকারের দার্শনিক। এই দর্শনের গুরুত্ব অবশ্যই আছে।

একটা উপমা দিলে পরিস্কার হবে। --

মনে করি একজন কৃষক ধানের বীজ বুনছে কারণ বছর শেষে সে ধান বেচে তার সন্তানকে খাওয়াবে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ধান চাষের গুরুত্ব কতোখানি তা নতুন করে বলার কিছু নাই। এই ধান চাষের ব্যাপারটা অনেকটা সমাজের সাধারণ বুদ্ধিজীবীদের দর্শনের মতো। যেহেতু সমাজে, ইতিহাসে এবং নৃ-শাস্ত্রে অসংখ্য উপাদান বিরাজ করে, তাই তা দিয়ে অসংখ্য ছোট ছোট দর্শন তৈরী করা সম্ভব। তবে বীজের ধরণ এক্ষেত্রে ধানই। এর প্রায়োগিকতা যে বছর বোনা হলো সে বছরেই শেষ হবে।

কিন্তু একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, একজন কৃষক একজন মানুষও বটে। সে বিশ্রামকালে বড় গাছের ছায়াতলে বসে দুনিয়া নিয়ে ভাবতে চায়। সে অনুধাবন করে ধান উৎপাদন আর খানা-খাদ্য জোগাড় করা তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। বড় গাছটা তাকে সেই চিন্তার সুযোগ করে দিচ্ছে। শুদ্ধচিন্তার দর্শন হচ্ছে এই গাছটার মতো।

একটা ব্যাপার পরিস্কার করা জরুরী। ফুকো কিন্তু শুদ্ধচিন্তার দর্শন করছেন, বড় গাছই যত্ন করছেন। কিন্তু মানুষের কাছে তা প্রকাশ করছেন প্রামাণিক কাঠামোতে ফেলে। ফলে কৃষকের কাছে গাছটি আমগাছের রূপে হাজির হচ্ছে। আম কিভাবে কৃষকের অন্নসংস্থানে ভূমিকা রাখতে পারে এমন বিজ্ঞাপন আছে গাছটিতে। সেই লোভে হলেও কৃষক গাছটির ছায়াতলে আসছে, এতেই ফুকোর সাফল্য।

অন্যদিকে হিড্‌গেন্সটাইনও শুদ্ধ দর্শন করছেন কিন্তু তাঁর গাছটা কৃষকের চোখে ধরা দিচ্ছে বটগাছের রূপে। বটের ফল যে সুস্বাদু না, তা চোখের সামনে প্রতীয়মান। তাই কৃষক এতে অন্নসংস্থানের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছে না। একমাত্র ছায়াতল কাম্য হলেই কৃষক গাছটির নিকট যাবে।

৩))

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এসব বাক্যব্যায়ের উদ্দেশ্য কি। সাধনা দুই রকম বোঝা গেলো, কিন্তু তাতে কি?

এসব বলার কারণ হচ্ছে মানুষ হিসাবে আমাদের আচরণকে একটু ফুটিয়ে তোলা। একাডেমিয়ার দিকে যখন আমি তাকাই তখন সাধনার এই রকমফেরের অনুধাবনের দারুণ অভাব দেখতে পাই। এখন একাডেমিয়াতে মৌলিক সাধনা করার ব্রিদিং স্পেস প্রায় শূন্যের কোঠায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শেখানো হয় যে সাধনা করতে হয় শুধুমাত্র প্রামাণিক কাঠামোর উপর ভিত্তি করে। চিন্তার এই দৈন্য মূলত পশ্চমা ধারার।

পঞ্চাশ বছর আগেও এতোখানি খারাপ অবস্থা ছিলো না। হ্যা, আগে যেটা ছিলো এবং এখনো আছে, তা হলো বাহ্যিক যুক্তিবিন্যাস প্রামাণিক কাঠামোর আদলে সাজাতে হবে। অর্থাৎ গবেষণালব্ধ ফল প্রামাণিক কাঠামো দিয়ে উপস্থাপন করতে হবে। পদার্থবিজ্ঞানেই আসি। আইন্সটাইন তাঁর সত্যিকারের চিন্তাপ্রক্রিয়া সেমিনারে উপস্থাপন করতে পারবেন না, তাঁকে একটা প্রামাণিক কাঠামোতে ফেলে গবেষণার ফল প্রকাশ করতে হবে। এটার একরকম জুরুরত আছে যদি আমরা সামষ্টিক অগ্রগতি বা collaborative progress কামনা করি। একই কথা ডিরাক, শ্রোডিঙ্গার, হিগস, সবার জন্য প্রযোজ্য। তবে আগে যেটা ছিল (কিন্তু এখন নেই) তা হলো গবেষকের যেটুকু ব্রিদিং স্পেস থাকতো, তা দিয়ে চাইলে তিনি মৌলিক সাধনা করে প্রামাণিক কাঠামোতে তাঁর গবেষণার ফল প্রকাশের ফুরসত পেতেন।

কিন্তু অসুবিধাটা ঘটেছে মৌলিক সাধনাপ্রক্রিয়াকে একেবারে অস্বীকার করার মাধ্যমে। সময়ের সাথে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে একজন নতুন গবেষকের পক্ষে প্রামাণিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে মৌলিক চিন্তা করার কোনো ফুরসতই নাই।

একজন নব্য গবেষক যে বছর বছর পেপারগুলো লিখেন, তা অনেকটা ধান চাষের মতো। সে গোলাভরা ধান চাইছে, যেনো বছর শেষে খাজনা দিয়ে সে পরের বছর আবার চাষ করার সুযোগ পায়। আর প্রতিবছর খাজনার পরিমাণ বেড়েই চলেছে। তার সময়ই নেই একটা বড় গাছ লালন করার।

আমাদের কয়েকটা ব্যাপার বুঝতে হবে।

• প্রথমত, যেকোনো শাস্ত্রের সামষ্টিক অগ্রগতি বা collaborative progress একমাত্র অগ্রগতি না। যাঁরা শুদ্ধ সাধনার করার পর তাঁদের গবেষণাগুলোকে প্রামাণিক কাঠামোতে আনার কোনো তাগিদ বোধ করেন না, তাঁদের দ্বারা উপকৃত হবেন নব্য সাধকেরা। এই অপ্রামাণিক দলিলগুলো বটবৃক্ষের মতো, যার ছায়াতলে মানুষ দুনিয়াদারির ঊর্ধে জগতকে দেখার প্রেরণা পায়।

• দ্বিতীয়ত, সামষ্টিক অগ্রগতি কামনা করলেও তার একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসে আরেক প্রকার শুদ্ধসাধনাকারী থেকে, যাঁরা সাধনা করেন প্রামাণিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে, কিন্তু সাধনার ফল প্রামাণিক কাঠামোর ভেতর ফেলে প্রকাশ করেন। এই কাজগুলো বড় বড় ফলবান বৃক্ষরাজির মতো। এটা আমাদেরকে দুনিয়ার রং রসের বিচিত্রতা দিয়ে সীমার মাঝে অসীমকে চেনায়।

• তৃতীয়ত, প্রামণিক কাঠামোর ভেতরে থেকে লব্ধ সাধনাগুলো সামষ্টিক অগ্রগতিতে একটি ভূমিকা রাখে। এটা ধান চাষের মতো। তাই এরও গুরুত্ব আছে উৎপাদনকে সচল রাখার দায়ে।

উপরে উল্লেখিত ক্যাটাগরিগুলো বোঝা জরুরি বলে মনে করি।

-- ফেব্রুয়ারী ২৮, ২০২১ ইং

The Unattainable অধরা Feb 2020
Illustration for “The Unattainable”

ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প পড়ার সময় বেশ কয়েকবার মনে ধাক্কা লেগেছে। কী অদ্ভুত উপলব্ধি! পছন্দের লাইনগুলি দাগিয়ে রাখতাম, যেন সেই দাগ দেয়াতেই আমার সার্থকতা। গল্পের প্রতিপাদ্য বিষয় আমার অতো একটা ভালো লাগতো না, এমনকি মনেও থাকত না। কিংবা এরপর কি হবে এমন ভেবে আটকে থাকতাম তাও না। তারপরেও গল্পে ফিরে আসতাম, কারণ রবীন্দ্রনাথ একটু পরপর তাঁর জীবনদর্শনের বীক্ষণযন্ত্র দিয়ে গল্পের ভেতরেই সূক্ষ সূক্ষ কিছু অনুভূতি নিগূঢ়ভাবে ফুটিয়ে তুলতেন। সেটাই ছিল আমার অমৃত!

যেসব লেখকের গল্পের প্রতিপাদ্য বিষয় আমার ভালো লেগেছে, তাদের নাম মনে নেই। ঈশপের পরে এই কাজ এতো ভালোভাবে কেউ করতে পেরেছে বলেও আমার জানা নেই। তবে দুই একটা খুব সাধারণ মানুষের লেখা গল্পের প্রতিপাদ্য বিষয় আমার ভালো লেগেছে। Bukowski এর ভাষায় বললে they are the strongest of the ‘strange ones’. কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে কোনো মানবসৃষ্ট গল্পের প্রতিপাদ্য বিষয় ভালো লেগে থাকলেও তা বেশিরভাগ সময় মনে দাগ কাটেনি।

হুমায়ূন আহমেদের লেখা যখন পড়েছি, তখন তার প্রধান চালিকাশক্তি ছিল “এরপর কী হলো” তা জানার কৌতুহল। এছাড়াও একটু পর পর তাঁর ইনজিনিয়াস হিউমার বা রসবোধ আমার মনোজগতকে বেশ নাড়া দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ আর হুমায়ূনের লেখার মধ্যে একটা মজার পার্থক্য আছে বলে আমার মনে হয়েছে। তা হলো হুমায়ূনের কথা আমাদেরকে তাঁর মতো করে ভাবিয়েছে। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের কথা আমাদেরকে একাধিকবার ভাবিয়েছে, তবে তাঁর মতো করে না, পাঠকের মতো করেই। এটা ভালো খারাপের প্রশ্ন না। লেখার ধরণের ভিন্নতা।

মূল কথায় ফেরত আসি। রবীন্দ্রনাথ বা হুমায়ূনের কোনো একটা কথা এতো ভালো লাগবেই বা কেনো? নিশ্চই মনে হয়েছে “আসলেই তো! এমনভাবে চিন্তা করিনি কখনো”। আমি বলব ব্যাপারটা তা না। যেকোনো লেখা ভালো লাগে কারণ সেই কথাগুলো ইতিমধ্যে আমার ভিতর ছিলো। শুধুমাত্র এতোদিন তা কোনো ভাষায় অনুদিত হয়নি। বড় বড় সাহত্যিকরা যেটা সবথেকে ভালো পারেন তা হলো এই untranslated অনুভূতিকে ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করতে। Untranslated কথাগুলো মনের মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে থাকে, আরো ঠিক করে বললে অনেকটা fuzzy form এ। যে মুহুর্তে লেখকের জবানে কথাটা শুনি, তখনি সেটার concretized form তৈরী হয়। এর একটা অবশ্য বিপদ আছে, মানুষ fuzzy form টা কে জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে অবচেতনে পরিবর্তন বা পরিমার্জন করতে পারে। কিন্তু concretized form কে সাধারণত সে ঘাটায় না। একবার মনে গেঁথে গেলে সেটাই ফিরে ফিরে আসতে থাকে। অতএব বই পড়ার বিড়ম্বনাও আছে!

যাইহোক মদ্দাকথা হলো, লেখকের উপলব্ধি তখনি পাঠকের বোধগম্য হয় যখন পাঠকের মধ্যে তা আগে থেকেই বিরাজ করে। এটা একটা অদ্ভুত ডাইলেমা। পাঠক এবং লেখকের মানবিক গঠন কাছাকাছি না হলে একজনের সাথে আরেকজন communicate করতে পারে না। এমন বলা হচ্ছে না যে লেখক ভালো মানুষ হলে পাঠককেও ভালো মানুষ হতে হবে। সচেতন মূল্যবোধগুলো দুইজনের আলাদা হতেই পারে, কিন্তু সুন্দর-অসুন্দরের, সাদা-কালোর, লাল-নীলের বোধ কাছাকাছি হতে হবে। শিক্ষা/ সংস্কৃতি/ পরিবার কিংবা সমাজের গঠন আমাদের সবাইকে মোটামুটি এক কাতারে নিয়ে আসে। তাই সমাজের বেশিরভাগ চোর, ডাকাত, শিক্ষক, ডাক্তার, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, সাদা মানুষ, কিংবা দুর্নীতিবাজের মানবিক গঠন একই। ভালো খারাপের প্রশ্ন এইটা না।

এখন আসল প্রশ্ন করি। যারা এই কাতারের বাইরে থেকে আসে, তাদের কথা শুনলে বা লেখা পড়লে আমরা কী কিছু বুঝতে পারব? এই পর্যায়ে একটা ব্যাপার পরিস্কার করা দরকার। যেসব কথা rational reasoning এর আওতায় পড়ে, তা এখানে বিবেচ্য না। কারণ rational reasoning এর একটা universal structure আছে, যাকে আমরা 'যুক্তি' বলি। এই অংশটা মোটামুটি প্রিমিটিভ, তাই জীনগতভাবেই মানুষ যুক্তি বুঝতে সক্ষম। এর আগে আমার “প্রকৃতি ও সত্য” নামের লেখাটিতে ব্যাখ্যা করেছি কেন একটা শিশু ভাষা শিখতে পারে। ভাষার সাথে সাথে যুক্তির অনুধাবনের প্যাকেজটা ফ্রি তে চলে আসে।

একটু ব্যাখ্যা করলে সহজ হবে।

আমরা যখন মনে মনে যুক্তির বুনন ঘটাই তখন চিন্তাক্ষেত্রে সবসময় একটা ভাষাকে আশ্রয় করি। অর্থাৎ আমরা যুক্তি বুনি ভাষা দিয়ে। ভাষা ছাড়া যুক্তির দৌড় নেই বললেই চলে। (তার মানে এই না যে ভাষা শুধু যুক্তি নিয়ে এসেছে, যুক্তির সাথে সাথে সে আরো অনেক কিছু এনেছে)। মূলকথা হলো, যেহেতু মানুষ ভাষা জানে, তাই যুক্তিও বুঝতে সে সক্ষম কোনো প্রকার External Influence (শিক্ষা/ সংস্কৃতি/ সামাজিক বা পারিবারিক গঠন/ প্রকৃতির সান্নিধ্য লাভ ইত্যাদি) ছাড়াই।

অতএব rational reasoning এর আওতাধীন কথা দিয়ে দুইজন ভিন্ন কাতারের মানুষ কমিউনিকেট করতে পারে। যেমন “গরম লাগছে, ফ্যানটা ছেড়ে দেন” কিংবা “খিদা লেগেছে ভাই? দুইটা ভাত খান আমার সাথে” ইত্যাদি সাধারণ কমিউনিকেশন এর স্ট্রাকচারটা universal, কাতারভিত্তিক না। কাতারের ব্যাপারটা চলে আসে যখন ভাবের কথা আদান-প্রদান ঘটে, যা rational reasoning এর বাইরে অবস্থিত।

কোনো কোনো মানুষের ক্ষেত্রে এমন হয় যে তারা ভাবসমুদ্রে এতোই মজে যায়, rational structure এ আসতে অত্যন্ত বিরক্তিবোধ করে, নোংরা লাগে। এদেরকে অনেকসময় আমরা ভাবের পাগল বলি।

আবার “Trauma” একটা বিশাল External Influence. এটা মানুষকে এমন কাতারে নিয়ে যেতে পারে যেখানে rational structure কাঁটার মতো, ভীষণ যন্ত্রণা তৈরী করে যখনি সে rational space এ যাওয়ার চেষ্টা করে। এদেরকে সরাসরি আমরা পাগল বলি, কারণ তাদের সাথে rational communication করা যায় না। যেটুকু সে করে তা শুধু বাঁচার তাগিদে। (পাগল যে শুধু এদেরকেই বলে তা কিন্তু বলা হচ্ছে না, তবে এখানে সেটা নিয়ে আলোচনা করব না।)

যাইহোক আমার মূল প্রশ্নে ফেরত যাই। যারা সাধারণ কাতারের মানুষ, তারা কি অন্য কাতারের ভাবের কথা বুঝতে পারবে? আমি মনে করি পারবে না। যেমন আমি লালনের কথা বুঝতে পারি না। এবং আমি নিশ্চিত, যারা বোঝেন বলে দাবি করেন তারাও বোঝেন না, যদি না তারা সাধক হয়ে থাকেন। ব্যাপারটা কিছুই না, বোঝার জন্য যে উপকরণগুলো প্রয়োজন, তা সবার মধ্যে থাকে না। এই উপকরণগুলো যাপন আর সাধনের মাধ্যমেই কেবল অর্জন করা সম্ভব। একই কথা সুফী সাধকদের জন্য প্রযোজ্য। এক সুফী আরেক সুফীর সাথে ভাবের কথা আদান-প্রদান করতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষকে সেটা বললে বিরাট ভুল হয়ে যাবে। আমরা যারা সাধারণ কাতারের মানুষ, আমাদের ঐ বিশেষ ভাব বোঝার উপকরণ অনুপস্থিত। ফলে ভাবের অভাবে আমরা কথাটাকে rational space এ জোর করে ঢুকিয়ে বোঝার চেষ্টা করব, যার পরিণাম হবে Misinterpretation. এইজন্যে এধরণের বিদ্যাকে গোপন রাখা বাঞ্ছনীয়। এটাকে সাধকের গুপ্তবিদ্যা বলা যায়।

ক্ষুদ্র পরিসরেও আমরা এই ব্যাপারটা দেখতে পাই। যেমন কবির কবিতা কিন্তু পুরাটাই ভাবের কথা। কবিতা বুঝতে হলে কবিকে অনুভব করতে হয়। যার ভিতর সেই ইচ্ছা এবং empathy নাই, সে কবিতা বুঝবে না। একইভাবে রবীন্দ্রনাথ এবং আইন্সটাইনের মধ্যে যে ভাবের সংযোগ ঘটবে তা সাধারণ পাঠকের বুঝতে বেগ পেতে হবে। সাধকদের ক্ষেত্রে এই সাধারণের না বোঝার মাত্রাটা পর্বতসম।

তাহলে প্রশ্ন থেকে যায় যে সাধকেরা কি আমাদের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারবে না? কোনো ভাবের কথাই কি থাকবে না ভবিষ্যতের পাঠকের জন্য? হ্যা পারবে, তবে শুধু ধাঁধাঁর মাধ্যমে। Riddle বা ধাঁধাঁ ভাষার একটা অনন্য উপকরণ। অনেকটা encrypted message এর মতো। মজার ব্যাপার হচ্ছে, context না ধরতে পারলে ধাঁধাঁ সমাধান করা যায় না। এক্ষেত্রে সাধকের ভাব পাঠকের হৃদয়ে তৈরী না হলে context ধরা সম্ভব না এবং ধাঁধাঁ সমাধানের চেষ্টা পর্যন্ত সে করতে পারবে না। অতএব misinterpretation থেকে কথাটা রক্ষা পাবে। পাঠক যদি সাধনের মধ্য দিয়ে মনকে উপযুক্ত করতে পারে, তাহলেই সে সমাধান করতে পারবে। Hence, saints have to be necessarily mystique. এটা কোনো ছেলেভোলানো কর্মকান্ড না। প্রয়োজনেই এমন। সাধক তাঁর মনের কথা একমাত্র হেঁয়ালি করেই বলতে সক্ষম।

সুতরাং, অধরা ধরার নয়!

(ফেব্রুয়ারী ২, ২০২০ ইং)

The Nature of Truth সত্যের স্বরূপ Jan 2020
Illustration for “The Nature of Truth”

যে যেমন, তার দুনিয়া তেমন। এই কথার একটা মাজেজা আছে। জীবন দর্শনের সাথে এর সম্পর্ক গভীর। সত্য কেমন তা বুঝতে এর উপলব্ধি হওয়া জরুরী। মানুষ দুইটা ঘটনা দেখলে একটার সাথে আরেকটার যোগসাজস খুঁজতে চায়। সেই যোগ 'rational' হতে পারে, আবার হতে পারে 'irrational'। Irrational মানেই যে কুসংস্কার তা বলা হচ্ছে না। অনেক ঘটনাই ঘটে যুক্তি ছাড়া। যেমন একটা ছেলে কোনো একটা মেয়েকে দেখে হাসল। কিন্তু প্রত্যুত্তরে মেয়েটা ভেঙচি কেটে দিল। কোনো মানে হয় না। তাই বলে এই দুইটা ঘটনার মধ্যে কী কোনো যোগ নাই? অবশ্যই আছে। এই যোগ যুক্তির বুননে তৈরী হয়নি, আবার কুসংস্কার থেকেও আসেনি।

আবার যেমন ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। ঘটনাটার যৌক্তিক বুনন হচ্ছে যে আকাশে কোনো ঝড়ের রাতে মেঘ করেছিল। মেঘে মেঘে ঘর্ষণে তারপর বজ্রপাত হয়। গরুর ঘর পুড়ে যায়। গরু এখন মেঘ দেখলেই ভয় পাচ্ছে। যোগটা যে যৌক্তিক বুনিয়াদি থেকে গরু তৈরি করেছে তা না। আবার কুসংস্কার বলা যাবে তাও না। গরু হয়তো সম্পূর্ণ অন্যকিছু দিয়ে দুটা ঘটনার সংযোগ ঘটাচ্ছে।

সাহিত্য চর্চার দিকে তাকাই। আমরা যখন একটা উপন্যাস পড়ি তখন তা ভালো লাগে কারণ উপন্যাসের ঘটনাগুলোর মধ্যে আমরা পারস্পরিক সংযোগ ঘটতে পারি। এই সংযোগের একটা বড় অংশের rational ভিত্তি নাই, কিন্তু তা কুসংস্কারও না।

যাইহোক, মূল কথা হচ্ছে আমরা দুইটা ঘটনার মধ্যে যোগসাজশ খুঁজতে চাই। সেটা যুক্তি দিয়ে হোক, যুক্তি ছাড়া হোক কিংবা কুসংস্কার দিয়ে হোক। জীবন যেহেতু অসংখ্য ঘটনার সমষ্টি, তাই প্রতিটা সংযোগ বর্ণনা করার মধ্যে সার্বিক অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা যখন বলি "to make sense of this world" তখন আমরা আসলে এমন একটা মূলনীতি খুঁজি যা দিয়ে এই সংযোগ গুলোকে একসাথে address করা যাবে। এই মূলনীতিকে আমরা naively বলি বিশ্বদর্শন বা worldview.

উদাহরণ দিলে পরিস্কার হবে ব্যাপারটা। ধরি কাউকে প্রশ্ন করা হলো "How the world works?"

১))

একশ্রেণির মানুষের উত্তর হবে, পৃথিবী চলে অর্থ দিয়ে। মানুষের আচরণ, সামাজিক গঠন, ধর্মের প্রচার, সবকিছুর ভিত্তি অর্থনৈতিক। সভ্যতার মূলে অর্থ। লেখনীপদ্ধতি চালু হবার কারণ অর্থ। গণিতের উৎপত্তি এই অর্থের হিসাব রাখা থেকেই। আধুনিক যুগের শুরু industrialization এর মাধ্যমে, যার মূলে রয়েছে আর্থিক লেনদেন। জ্ঞান বিজ্ঞান সাধনায় ল্যাব নির্মান ও ব্যবহারের জন্য যা দরকার হয় তা অর্থ। এইযে চলমান বিশ্বরাজনীতি, তার চালিকা শক্তি কী? পশ্চিমা বিশ্বের industry চালাবার জন্য জ্বালানী শক্তির প্রয়োজন। আর তা আরবদের থেকে যখন কেনা শুরু করল, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার west থেকে middle east এ যাওয়ায় আরবরা রাতারাতি ধনী হয়ে গেলো। এই একমুখি flow নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ল continuous conflict এর। প্রগতিশীল নেতাদের হত্যা/ অপসারণ এবং যুদ্ধবাজদের funding করার মাধ্যমে শুরু হলো এই প্রয়াস। এতে আরব বিশ্বকে কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র কিনতে হলো মার্কিন মুল্লুক থেকে। এরকম হাজারো যুদ্ধ, হাজারো চুক্তি, সবকিছুর মূলে অর্থ।

ছোট ছোট personal ব্যাপারগুলোকেও অর্থ নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থ থাকলে gym এ যেয়ে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া যায়। ভালো nutrition পেলে লম্বা চওড়া হওয়া যায়। যেমন কোরিয়ার অর্হনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে তাদের গড় উচ্চতার বড় পরিবর্তন এসেছে। সৌন্দর্য রক্ষা ও বর্ধনের জন্য spa, yoga, vegan diet ইত্যাদির অনস্বীকার্যতা এই অর্থই নিশ্চিত করেছে।

বৃদ্ধ বয়সে দেখাশোনা করার জন্য একমাত্র ভরসা করা যায় সন্তানকে। তাই এই সম্পর্ক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখার জন্য পিতা-মাতা-সন্তান নামক বন্ধনের স্থায়ীকরণ করা জরুরী, যা সম্ভব হয় 'বিয়ে' নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। সমাজ এই দায়িত্ব নিয়ে নিলে আর বিয়ের প্রয়োজন থাকে না, যা ঘটছেও বিভিন্ন দেশে। মানুষের সামাজিক মর্যাদা অর্থকেন্দ্রিক। এমনকি প্রেমের সম্পর্ক মধুর হয় অর্থের মাধ্যমেই। অর্থ থাকলে ভালো ক্যামেরা কেনা যায়, সুন্দর সুন্দর ছবি তোলা যায়। জন্মদিন কিংবা ভ্যালেন্টাইন ডে তে ম্যাজিকাল সারপ্রাইজ দেয়া যায়। মনোমালিন্য হলে অর্থ খরচ করে সুন্দর সুন্দর জায়গায় যাওয়া যায়, সুন্দর সুন্দর হোটেলের প্যাকেজ কিনে মন ভোলানো যায়। আবার গুরুত্বপূর্ণ মহৎ কাজগুলোও অর্থ থাকলেই করা সম্ভব হয়। Ayn Rand এর ভাষায় বললে “best way to help the poor is not to be one of them!” তাই তিনি সেই সিস্টেমের পক্ষে কথা বলেছেন যা প্রতিষ্ঠিত হয় সমাজে আর্থিকভাবে উন্নত শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে। Exactly এই সিস্টেমটাই moderate capitalist system. একজন আরেকজনের থেকে উন্নতি না করার সুযোগ থাকলে competition থাকে না, তাই থাকেনা কাজ করার incentive.

এখন কেউ বলতে পারে অর্থের প্রতি নির্ভরশীলতা একটা মানবসৃষ্ট অবস্থা, তাই ব্যুৎপত্তিগত ভাবে দেখলে উপরে উল্লেখিত সমস্ত যুক্তি ভিত্তিহীন। কিন্তু একজন প্র্যাক্টিকাল মানুষ প্রথমে নিজেকে বর্তমান অবস্থায় স্থাপিত করে, কোনও abstract hypothetical space এ না। হাইডেগারিয়ান ভাষায় বললে “we are thrown into the world, and that is the first reality.” আমি যেহেতু অর্থের উৎপত্তিলগ্নে ছিলাম না, তাই সেই অবস্থানে দাঁড়িয়ে সমাজের দিকে তাকানো অর্থহীন। নিজেকে বর্তমানে স্থাপিত করলে আমরা দেখি অর্থ আছে এবং অর্থই সমস্ত পৃথিবীর চালিকাশক্তি। তাই “misery of human being” কে address করতে হবে অর্থ দিয়েই (যেমন social business), মানুষের দুর্দশা দূর করতে হবে এই অর্থ দিয়েই। মানুষের দুর্দশা নিয়ে ভেবেছেন বা দূর করার prescription দিয়েছেন অনেক বড় বড় সাধু সন্ত দার্শনিক। আচ্ছা, তাদের সামাজিক অবস্থান কি ছিল? গৌতম বুদ্ধ ছিলেন রাজপুত্র। উনি রাজপুত্র না হলে পৃথিবী যে দুঃখময় তার বুঝ আসত কিনা এতে সন্দেহ আছে। Philosopher of the philosophers, Ludwig Wittgenstein, ছিলেন ভিয়েনার সবথেকে ধনীর সন্তান। তাই উনি বিত্ত বৈভবকে নিকুচি করতে পেরেছিলেন। একই কথা বার্ট্রান্ড রাসেল, কনফুসিয়াস, কার্ল মার্ক্স, সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সামন্ত আমলে যখন ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য ধরা ছোঁয়ার বাইরে ছিল, তখন জমিদার সন্তানদের হাত ধরে গড়ে উঠেছে বিশ্বের সবথেকে মানবতাবাদী সাহিত্য, কবিতা, গল্প। দর্শন, সাহিত্য, কলা এসব করার জন্য অফুরন্ত সময় প্রয়োজন, আলস্য প্রয়োজন, চিন্তা করার বিলাসিতা প্রয়োজন, যা শুধুমাত্র অর্থের জোরেই আসে। The world works through the dynamics of money.

২))

আবার একশ্রেণীর মানুষ বলবে পৃথিবী চলে ক্ষমতার জোরে। শুরুটাই হয়েছে “survival of the fittest” থেকে। আজকের মানুষ সমস্ত পৃথিবীকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, যার মূলে আছে সংঘবদ্ধতা। আর অন্যকে সংঘবদ্ধ করে নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারাকেই বলে ক্ষমতা। অর্থ থাকুক আর না থাকুক কিছু আসে যায় না। ইতিহাসের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। পৃথিবীতে অনেক বড় বড় শাসককে exile এ পাঠিয়ে দেয়ার পর নিজের অবস্থান ফেরাতে পেরেছে এমন ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। অর্থ হাতে আসবে যাবে, কিন্তু ক্ষমতা সবার জন্য না। আজকে সিঙ্গাপুর, আরব এইসব দেশে অনেক অর্থ, কিন্তু তারা কি বিশ্ব চালাচ্ছে? বিশ্ব চালাচ্ছে আমেরিকা, রাশিয়া, চায়না, ইসরাইল, এসব দেশ। এসব দেশই সামরিক এবং প্রযুক্তিগতভাবে সবথেকে শক্তিশালী, যা ক্ষমতার উৎস হিসেবে কাজ করে। পৃথিবীর যত বড় বড় নেতা তাদের কয়জন টাকার পিপাসু ছিল? গান্ধী কিভাবে চলতেন? ভাষানী কিভাবে চলতেন? অথচ গোটা জাতির মোড় ঘুরিয়ে ফেলতে পেরেছিলেন তাঁরা। এতো এতো সাধু সন্ত পৃথিবীতে এসেছে, কেউ বিলাসী জীবনযাপন করেনি, কিন্তু তাঁদের বাণীতে আচ্ছন্ন হয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মও দীক্ষিত হয়েছে। গৌতম বুদ্ধের কথা আমরা যখন স্বরণ করি, উনি রাজা ছিলেন নাকি ভিক্ষুক ছিলেন তা নিয়ে কেয় মাথা ঘামাই না। মাথা ঘামাই তাঁর ক্ষমতাধর কথা নিয়ে।

পুরুষতন্ত্রের মূলে কী? এমন তো না যে নারীরা Genetically inferior. একটু ভাবলেই দেখা যাবে it exactly boils down to the power of tradition. বিয়ে এই tradition এর একটা অংশ। তাই বিয়েকে পুরুষের ক্ষমতায়ন আর বিয়ে না করাকে নারীর ক্ষমতায়ন হসেবে ভাবাটা একেবারে যুক্তিহীন না।

ক্ষমতা দিয়ে মিথ্যাকে সত্য আর সত্যকে মিথ্যা বাণীয়ে দেয়া যায়। History is written by the winners! তাই প্রাচীন সাহিত্যে রোমান সাম্রাজ্যের বীরত্ব গাঁথা, তাদের মানবতাবোধ, সভ্যতা ইত্যাদি দেখতে পাওয়া যায়, আর জার্মানদের দেখানো হয় একটা বর্বর জাতি হিসেবে। এর কারণ রোমানরা জয়ী হয়েছিল, আর জার্মানরা পরাজিত। ধর্ম অর্থ আনেনি, এনেছে ক্ষমতা, যার শক্তিতে বড় বড় সাম্রাজ্যের পতন হয়েছে, পরিবর্তন হয়েছে, পরিবর্ধন হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যাপারেও এটা লক্ষ্যনীয়। ক্ষমতা থাকলে বিনা পয়সায় সরকারি হেলিকপ্টারে চেপে বিয়ে খেতে আসা যায়, আর ক্ষমতা না থাকলে বি এম ডাব্লিউ থাকার পরেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থাকা লাগে। যেহেতু ক্ষমতার পাঠ ও প্রক্রিয়াজাতকরণকে রাজনীতি বলে, তাই রাজনীতিই সব! The world works through power.

৩))

একশ্রেণীর মানুষের কাছে পৃথিবী চলে নিজের মত। কিছু মানুষ নিয়ন্ত্রণ করে ব্যাপারটা তা না। যাকিছু হয় সবকিছুর মূলে নিয়তি। আজকে আমি মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করেছি, এটা একটা নিয়তি। কারো কারো জন্ম হয় সোনার চামচ মুখে নিয়ে, আবার কারো হয় জারাজীর্ণ কুটিরে। অর্থব্যবস্থা, ক্ষমতাতন্ত্র, কোনও কিছুই বৃহৎ পরিকল্পনা থেকে মানুষ তৈরী করেনি। হয়েছে কাকতালীয়ভাবে। পূর্ণিমার চাঁদ যখন ঝলসানো রুটি, তখন দেশ-জাতি, কালো-সাদা, শিয়া-সুন্নী কোনও কিছুই কাজ করে না। ঠিক তখন সত্য উদ্ভাসিত হয় সূর্যালোকের মতো। আর তা হলো মানুষের হাতে সত্যিকারভাবে কিছুই নাই। তাই লৌকিক মতবাদ ভিত্তিহীন। দুনিয়াবি রংগলীলায় মাতোয়ারা থেকে বড় বড় মতবাদ, যুক্তি, সভ্যতা কিংবা অসভ্যতা কপচানো যায়, কিন্তু একটু অন্যরকম হলেই সবকিছু ভেঙ্গে চুরে ধূলিস্বাত হয়ে যায়। চুরি ডাকাতি লুট ধর্ষণ সবই তখন বৈধ। সুতরাং মানুষের ন্যায় অন্যায় ধার্য করার যোগ্যতাই নাই। সবথেকে বড় সত্য হলো আমি আছি। আমি বেঁচে থাকতে চাই। অতএব আমি বিচার চাই। কিন্তু কোনও হারামজাদার বিচার তো মেনে নিব না। সবাই ধান্দাবাজ, ভিতরের মুখটা কুশ্রী। আমি চাই কর্মফল, Karma! আমি চাই জন্মের শাস্তি, perpetual torment! আমি চাই গায়েবী বিচার, divine justice! নাহলে যে কিছুই মিলছে না! তাই দুইটা সম্ভাব্য উত্তর দেখি।

এক-- পৃথিবী কেউ চালায় না, সেক্ষেত্রে কোনও কিছুরই মূল্য নাই। কোনও পরিকল্পনার যুক্তি নাই। পৃথিবীতে কার নিয়ন্ত্রণ কতো এবং কেমন হওয়া উচিৎ এটা একটা উজবুকি প্রশ্ন। বড় বড় ধারণাগুলো ছোট ছোট স্বার্থবাদী ধারণার সমন্বয়ে কাকতালীয়ভাবে তৈরী হয়েছে। বৃহৎ ব্যাপক পরিকল্পনা থেকে দেশ, সমাজ, বিচারব্যবস্থা তৈরী হয়নি, হয়েছে ইতিহাসের কাকতালের সমন্বয়ে। অতএব দেশ-সমাজ নিয়ে ভাবনাও উজবুকি।

দুই-- নিয়তি নির্ধারিত, আর পৃথিবী চলে নিয়তি নির্ধারকের অঙ্গুলি হেলনে। সেক্ষেত্রে সমস্ত যুক্তি, কার্যকারণ হচ্ছে উছিলা। উন্নতি করার উচ্চকল্পনা তাই অপ্রাসঙ্গিক। যে দেখার সে দেখবে। আমার চেষ্টা সফল হবে নির্ধারকের নির্দেশেই, বিফলও হবে একইভাবে। ভাঁড়ে চলে যাবে তোমাদের প্ল্যান প্রোগ্রাম।

In any case, the world is all about fate, whether spontaneous or controlled.

৪))

একশ্রেণী বলবে পৃথিবী আসলে চলে না। মহাকালের যে অংশে পৃথিবীর মানুষের অস্তিত্ব সম্ভব, তা একটা মুহুর্তের মতো। যাকে আমরা Balance বলছি, তা আসলে মহাকালের চোখে একটা transient state. প্রাণীজগতের ইতিহাসের ক্ষুদ্র অস্তিত্বকালকে হয়ত মনে হতে পারে একটা steady state, কিন্তু আদতে এটা ভ্রম। এই ভ্রমের মধ্যেও আরও অনেক ভ্রম আছে। মানুষ ধরেই নেয় পৃথিবী একটা delicate balance এর মধ্যে টিকে আছে। ব্যাপারটা মোটেও তা না। জিজেকীয় ভাষায় বললে “mother earth is a cruel bitch!” এর সবথেকে বড় প্রমাণ হচ্ছে পৃথিবীর অভ্যন্তরে তেলের প্রাচুর্যতা। কী পরিমাণ catastrophe এর মধ্যে দিয়ে পৃথিবী না গেলে এই পরিমাণ তেল খনিতে থাকতে পারে! আজকে আমরা climate change নিয়ে বড় বড় কথা বলছি, যেন আমরা চাইলে এই ব্যাপারে কিছু করতে পারব! আদতে কিছুই আসবে যাবে না। প্রাণী আসে, প্রাণী extinct হয়। একেবারে নিরীহ বুদ্ধের থেকেও বৌদ্ধ নিরামিষভোজী ডাইনোসরগুলোও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। মানুষও হবে। অন্য কোনও প্রাণী সেই জায়গা দখল করবে। হয়ত তারা মানুষের থেকেও বুদ্ধিমান হবে। আবার তারাও নিশ্চিহ্ন হবে। এমনকি এই পৃথিবীও নিশ্চিহ্ন হবে সূর্যের জ্বালানী কমে গেলে। এছাড়া মহাজাগতিক উল্কাপিণ্ড তো আছেই।

জীবনের কোনও উদ্দেশ্য নাই; এমনকি ক্ষুদ্র স্থায়িত্বের উপর ভিত্তি করেও কোনও আপাত উদ্দেশ্য প্রণয়ন করা যায় না। জগতে নিয়তি বা কাকতালও নাই। যা ঘটে তা একটা বিশাল probability অঙ্কের ফলমাত্র। আমরা নিজেরাই এই অঙ্কের অংশ। অঙ্কই আমাদেরকে এনেছে, অঙ্কই আমাদের মুছে দিবে। যা সত্য তা হলো Chaos. আমরা এসেছি Chaos থেকে, আমাদের জীবন একটা Chaos এর ভিতর দিয়ে যাবে আর তারপর Chaotically নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

এই যে এত অপরাধ, অনাচার, যুদ্ধ, প্রেম, শান্তি সবই এই অনিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলার একটা দশা। কোনও একটা random উপায়ে আমরা এই Chaos এর দর্শক হতে পেরেছি। তাই যা করা উচত তা হলো মানুষের seriousness কে উপহাস করা। সমাজ যে শৃঙ্খলার মুখোশ দেখায়, তাকে নিয়ে মস্করা করা। Camus এর কথায় বললে নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করা যেন আপন অস্তিত্বই একটা বিদ্রোহ আকারে সমাজের কাছে ধরা দেয়। যতটা পারা যায় নিজের কামনা বাসনা চরিতার্থ করা আর establishment নিয়ে মজামারি করা। যদি পারা যায় বোনাস হিসেবে খ্যাতি উপভোগ করা।

So, the world does not work, it is just a chaos.

৫))

একশ্রেণী বলবে পৃথিবী এতদিন পর্যন্ত যেভাবেই পরিচালিত হোক না কেনো, সামনে তা চলবে বিজ্ঞান দিয়ে। অর্থের প্রয়োজনীয়তা, ক্ষমতার প্রয়োজনীয়তা, এমনকি ভাগ্যের প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে যাবে যখন বিজ্ঞান আরও এগিয়ে যাবে। ভুলভ্রান্তি অরিক্রম করে মানুষ বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। সভ্যতা আসলে কী -- জ্ঞানের বিকাশ আর তার প্রয়োগ ছাড়া তো কিছু না। জ্ঞান বিকাশের ধারা শুরু থেকেই যে এমন ছিল তা না, কিভাবে প্রশ্ন করতে হয় তা আমরা শিখেছি ধীরে ধীরে। এদিক ওদিক করতে করতে আস্তে আস্তে সঠিক প্রশ্ন করার দিকে এগিয়েছি আর কিভাবে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয় তা জেনেছি। জ্ঞানার্জনের সঠিক ভাষা যে বিজ্ঞান, তা বুঝেছি এইতো কয়েকশ বছর হলো আর তা খুব শীঘ্রই সার্বজনীন হয়ে যাবে। এর আগে গভীর প্রশ্নগুলো নিয়ে যে শাস্ত্র আলোচনা করত তা হলো ফিলসফি। ফিলসফি গভীরে যেতে পারে ঠিকই কিন্তু তা অলীক কল্পনার উপর ভিত্তি করে। সঠিক প্রক্রিয়ায় চিন্তার জন্য প্রয়োজন Facts and Logic. প্রাপ্ত সিদ্ধান্তকে নিশ্চিত করার জন্য Experimental Verification. এই প্রক্রিয়ার বাইরে যা কিছু আছে তা অপ্রয়োজনীয়। বিজ্ঞান একসময় নিউরাল ম্যাপিং এর মাধ্যমে মানুষের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনুভূতি, এমনকি অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করতে পারবে। মানুষ যে একটা complex machine ছাড়া কিছু না, তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করবে। Virtual Reality এমন পর্যায়ে চলে যাবে যে মানুষ সেখানেই বাস করা শুরু করবে আর পৃথিবীকে যেমন চায় তেমন বানিয়ে নেবে। শরীরের প্রয়োজন পড়বে না। জারে মস্তিষ্ক সংরক্ষণ করে Matrix World এর মতো কোনও একটা জগতে চিরকাল সুখে শান্তিতে থাকবে। খুব বেশী ইচ্ছা করলে সেই জগতেও দয়াল বাবা কিবলা কাবা হাজির করা যাবে। বার বার একই মানুষ কিংবা ভিন্ন মানুষের প্রেমে পড়া যাবে। এই পুরো Machinery এর নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেয়া হবে Artificially Intelligent কোনও সিস্টেমকে। একসময় মস্তিষ্কের সমস্ত content কে Biological brain এর বাইরে নিয়ে এসে একটা সার্ভারের মধ্যে স্টোর করা যাবে। মগজ থেকে বের হয়ে এসে মানুষ তখন মগজের limitation অতিক্রম করবে। নতুন ইচ্ছা-অনুভূতির অস্তিত্বের দেয়াল অতিক্রম করবে। এরও পরে সমস্ত মানুষের ইলেক্ট্রনিক ভার্সন কোনও এক প্রক্রিয়ায় একসাথে করে নতুন ঐকতান তৈরী করা যাবে। Super Intelligence এর যুগ শুরু হবে। এমন একটা সিস্টেম maintain করার জন্য পৃথিবীতেই যে থাকতে হবে তা না। মহাশূন্যে কোনও এক স্পেসশীপে সিস্টেমটা থাকতে পারে। আর পরিচর্যার মধ্যে থাকলে তা অবিনশ্বরও হতে পারে। সময়ের ধারণা যেহেতু নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আর maintenance প্রক্রিয়া যেহেতু active, তাই স্পেসশীপ কত দ্রুত চলছে বা আস্তে চলছে এতে কিছু এসে যায় না। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে সিস্টেমটা চষে বেড়াবে, তথ্য সংগ্রহ করবে আর Super Intelligence সেটাকে dissect করবে। অবশ্য মহাবিশ্বের phase পরিবর্তন হলে অন্যকথা। হয়ত Super Intelligence সেটা থেকেও নিজেকে অলীক রাখার উপায় বের করে ফেলবে।

সুতরাং, the world might have worked through some primitive mean, but it will eventually work through science for sure!

৬))

একশ্রেণী হয়ত বলবে পৃথিবী চলছে কারণ ভালোবাসা আছে। ভালোবাসা না থাকলে আমরা কবেই নিঃশেষ হয়ে যেতাম! মানুষের শুরু ভালোবাসা থেকে, সেটা জৈবিক হোক আর যাই হোক। এই ভালোবাসার বন্ধনই পারস্পরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। মানুষের বিশ্বাসের মূলে ভালোবাসা। সেই বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়েই সংঘবদ্ধ হওয়া এবং প্রাণীজগতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।

মনোজগতের উন্নতির জন্য সাহিত্যের অবদান কেউ অস্বীকার করবে না। সাহিত্যের প্রাণশক্তির মূলে passion, যা আসে ভালোবাসা থেকে। একই কথা বিজ্ঞানের জন্যও সত্য। বিজ্ঞান হয়ত ব্যাখ্যা করতে পারে বস্তুর বৈশিষ্ট্য কিন্তু বস্তুর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে পারে না। হয়ত বিজ্ঞান আমাদেরকে সম্পূর্ণ ভার্চুয়াল জগতে নিয়ে যাবে, কিন্তু সেই জগতে অবস্থানরত মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা, কলা, প্রেম এগুলো ব্যাখ্যা করতে পারবে না।

বিয়েকে অনেকে হয়ত অর্থনৈতিক কিংবা ক্ষমতাতন্ত্রের প্রয়োজনীয় উপকরণ হিসেবে দাঁড়া করাতে চায়। কিন্তু বিয়ে আমাদের মনের জগতে যা অবদান রেখেছে তা ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু দিয়ে কি ব্যাখ্যা করা যাবে? স্বামী স্ত্রীর পারস্পরিক অনুভূতির মাত্রা কিংবা পিতা-মাতা-সন্তান এই বন্ধনের যে আবেগ, যে নাড়ির টান, তাকে একমাত্র ভালোবাসাই জুতসইভাবে address করতে পারে। অন্যান্য ব্যাপারগুলো গৌণ হয়ে ওঠে থখন। শুধুমাত্র প্রতিশোধের স্পৃহা নিয়ে বাংলার মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েনি, স্বজাতির প্রতি ভালোবাসা না থাকলে এটা সম্ভব ছিল না। আজকে পৃথিবীতে এতো হানাহানি, রক্তারক্তি, বাদ বিবাদের মাঝেও আমরা হাসতে পারি, কবিতা লিখতে পারি, সর্বোপরি মানব বৈচিত্র্যের বিকাশ ঘটাতে পারি। অথচ এসব দুঃখ দুর্দশা দেখতে দেখতে আর সহ্য করতে করতে পাগল হয়ে যাওয়া ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। তারপরেও মানুষ পারে কারণ যখন এসব সহ্য করার পর সে ঘরে যাবে, তখন তাকে ভালোবাসার জন্য মা আছে, স্ত্রী আছে, সন্তান আছে, বন্ধু আছে। ভালোবাসার জোরেই সে বিকশিত হচ্ছে।

The world works through human activity and human being flourishes through love.

***********

এই উদাহরণগুলোতে আমরা দেখতে পাই, প্রত্যেক শ্রেণীর চিন্তার নিজস্ব যৌক্তিক গতিবিধি আছে। Each one of them seems consistent. প্রশ্ন হচ্ছে সত্যটা (হাকিকাত অর্থে) কি এসব কিছুর সমষ্টি? আমি মনে করি তা না। কারণ উদাহরণগুলোর যেকোনো একটাকে সত্য ধরলে বাকিগুলা খারিজ হয়ে যায়। আবার একটার কিছু অংশ নিয়ে, আরেকটার কিছু নিয়ে একটা মিশেল বানালে consistency বা যুক্তির প্রবাহ ঠিক থাকে না। অনেকেই আছে যারা এমন একটা মিশেল উপস্থাপনের চেষ্টা করে, কিন্তু inconsistency এর কারণে সেসব কথা motivational speech এ জায়গা করে নিতে পারলেও আদতে গার্বেজ ছাড়া কিছুই না। তাই প্রথমে এটা অনুধাবন করা জরুরী যে যুক্তির সামঞ্জস্যতা সত্য নিরূপণের জন্য যথেষ্ট না। আমরা অনেকেই এই ফাঁদে পা দেই। কোনও একটা কথা, ধরি X, বলার আগে তাকে সরাসরি না বলে যদি কোনও উপায়ে দেখাতে পারি ‘V’ থেকে ‘W’ এসেছে আর ‘W’ থেকে ‘X’, তাহলেই বেশিরভাগ মানুষ তা মেনে নেয়। অর্থাৎ তিন চার ধাপে conclusion টানলেই যেন কথাটা সঠিক হয়ে যায়! ব্যাপারটা মোটেও তা না। (এই ধরণের ধাপ সর্বস্ব যুক্তি দেয়াকে আমি বলি "মাইটা যুক্তি"। )

তাহলে প্রকৃত হাকিকাত কি? আমি একমাত্র যে সিদ্ধান্তে আসতে পারি তা হলো সত্য inorganic কিছু না, সত্য একটা Organic Entity. আমরা যেমন সত্যের সাথে interact করি সত্যও আমাদের সাথে interact করে। এটা অনেকটা খেলার মতো। "মায়ার খেলা" নাম দেয়া যেতে পারে। এই মায়ার খেলা এমন, যে আমি জগতকে যেভাবে দেখতে চাই জগত সেভাবেই আমার সামনে হাজির হয়। আমার ভূতভবিষ্যৎও তেমন হয়। মানুষের সামাজিক অবস্থান অনেকসময় নির্ধারণ করে দেয় কে কোন দৃষ্টিতে জগত দেখবে তা। একজন প্রান্তিক মানুষ খুব সম্ভবত জগতকে নিয়তির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবে, একজন ব্যবসায়ী খুব সম্ভবত দেখবে অর্থের দৃষ্টিকোণ থেকে, আর একজন রাজনীতিবিদ হয়তো দেখবে ক্ষমতার দৃষ্টিকোণ থেকে। আজিজ সুপার মার্কেট ভিত্তিক ধরি মাছ না ছুঁই পানি টাইপ বুদ্ধিজীবীরা হয়ত জগতকে দেখে Chaos হিসাবে। আর একজন নয়া পাতি-বিজ্ঞানবাদী হয়ত জগৎকে দেখবে শুধু বিজ্ঞান দিয়ে।

'মায়ার খেলা' সময়ের সাথে এসব দৃষ্টিকোণগুলোকে আরও পোক্ত করে। মানুষ তার জীবনের সমস্ত অর্জন/ বিফলতাকে একওই ভঙ্গিমায় ব্যাখ্যা করা শুরু করে। এভাবেই সে মায়ার দাস হয়ে যায়। এই অবস্থাকে naively আমরা বলি “dogma”. কিন্তু "মায়ার বাঁধন"- ধারণাটা তার থেকেও বড় কিছু। মানুষ যতদিন বেঁচে থাকে তার সামাজিক অবস্থানকে সে অনেক গুরুত্ব দেয়। তাই জীবদ্দশায় মায়ার বাঁধন থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব না। হয়তো এইজন্যে লালন বলেছেন মরার আগেই মরতে হয়। শুধুমাত্র এই উপায়েই পৃথিবীতে থেকে মায়ার খেলে বোঝা সম্ভব।

জগত হচ্ছে মায়া। মায়া মিথ্যা না, মায়া জাগতিক সত্য।

-- জানুয়ারী ৩০, ২০২০ ইং